গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির মূল রহস্য
বি.ডি.রহমতউল্লাহ্
বলা নেই, কওয়া নেই সরকার তার স্বভাবসুলভ পদ্ধতিতে হুট করে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম সম্পূর্ণ অনৈতিক ও অযাচিতভাবে বাড়িয়ে দিলো। বাংলাদেশে এখনও প্রায় ৭০% ভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় দেশে উৎপাদিত গ্যাস দিয়ে, আর প্রায় ৩০% বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় বিদেশ থেকে আমদানীকৃত তরল জ্বালানী তেল দিয়ে। আমাদের দেশে প্রাপ্ত একটি অতি মূল্যবান জাতীয় সম্পদ গ্যাস ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত বিভিন্ন গণবিরোধী সরকারগুলো গ্যাসকূপের প্রায় ৩০% বিদেশী কোম্পানীগুলোকে অসম চুক্তির মাধ্যমে উত্তোলনের জন্য ইতোমধ্যেই দিয়ে দিয়েছে। আর বাকী প্রায় ৭০% গ্যাসকূপ বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন কোম্পানীর আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। আমাদের কূপ থেকে উত্তোলিত প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম যেখানে নির্ধারিত হয়েছে ২.৫০টাকা ঘনমিটার, সেখানে বিদেশী কোম্পানী থেকে আমাদের দেশেরই গ্যাস কিনতে হচ্ছে প্রতি ঘনমিটার ৬.৫০ টাকায়। যেহেতু উত্তোলিত মোট গ্যাসের প্রায় ৭০% দেশীয় কোম্পানী কর্তৃক উত্তোলিত হয় এবং তা ন্যায্য মূল্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ অন্যান্য খাতে সরবরাহ হয়, কাজেই বিদেশী কোম্পানী কর্তৃক অত্যন্ত উচ্চ মূল্যে বাংলাদেশ গ্যাস কিনলেও গড়পড়তায় গ্যাস খাতে সরকারের লোকসান হচ্ছিল না। গ্যাসের এ গড় মূল্য বিবেচনা করেই হিসেব করে দেখা গেছে, এ মূল্যে ক্রয়কৃত গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন দর পড়ে ১.৭০ পয়সা, সর্বাধিক ১.৮০ টাকা প্রতি ইউনিট।
তা স্বত্ত্বেও সরকার বিদ্যুতের এ উৎপাদন ব্যয়কে পাশ কাটিয়ে জনগণের কষ্টকর জীবন-ধারনের ব্যথা ও দুঃসহ জীবন যাত্রার যাতনাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ভিন্ন কায়দায় ২০১০ সালে এক অভিনব দায়মুক্তি বিল এনে অবৈধ রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বসিয়ে বিদ্যুতের দর অস্বাভাবিক বাড়িয়ে দিয়েছে। বলা হয়েছিলো দেশে গ্যাস নেই। অথচ সরকারী ভাষ্য অনুযায়ী, এখনোও ভূমিতে প্রমানিত ১৬ টিসিএফ (ট্রিলিয়ন কিউবিক ফিট) গ্যাস আছে বলে বিশেষজ্ঞদের সুস্পষ্ট মতামত রয়েছে। যেখানে আমাদের বার্ষিক চাহিদা মাত্র ১ (এক) টিসিএফ। অর্থ্যাৎ একই চাহিদায় আরো ১৬ বছর আমরা নির্বিবাদে গ্যাস ব্যবহার করতে পারবো। আর এই ১৬ বছরে কি আমরা সাগরে যে অফুরান গ্যাস আছে বলে ধারনা করা হচ্ছে তা তোলার সক্ষমতা অর্জ্জন করতে পারবো না? আর বর্তমানে যে গ্যাসের চাহিদা যেখানে দৈনিক ৩০০ কোটি ঘনফুট, সরবরাহ করতে পারা যাচ্ছে মাত্র ২৫০ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ ঘাটতি রয়েছে দৈনিক ৫০ কোটি ঘনফুটের। তা কি পেট্রোবাংলা কর্তৃক ২০০৮-তে প্রনীত স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে এ ঘাটতি মিটাতে পারতাম না? উল্লেখ করা প্রয়োজন, ২০০৮ থেকেই গত ৬ বছর সরকার ইচ্ছে করেই দৈনিক সরবরাহ চাহিদার চেয়ে ৫০ কোটি ঘনফুট ঘাটতি অব্যাহত রেখেছিলো। অর্থাৎ ২০০৮ ইংরেজীতে যখোন দৈনিক চাহিদা ছিলো ১০০ কোটি ঘনফুট তখনো সরবরাহ করা হতো ৫০ কোটি ঘনফুট। আবার কিছুদিন পরে যখোন চাহিদা বেড়ে দাঁড়ালো দৈনিক ১৫০ কোটি ঘনফুট তখনো সরবরাহ করা হতো ১০০ কোটি ঘনফুট। আর এখন চাহিদা যেখানে ৩০০ কোটি ঘনফুট সেখানে সরবরাহ করা হচ্ছে ২৫০ কোটি ঘনফুট। রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল নামক বিষফোঁড়া সফলভাবে স্থাপন করা হয়েছে। তারই প্রতিক্রিয়া হিসেবে যেখানে ২০০৮-এর ১ অক্টোবর প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দর ছিলো ২.৬৪ টাকা প্রতি ইউনিট, সেখানে রেন্টাল বসিয়েই ১ ডিসেম্বর ২০১১ ইংরেজীতে তা বাড়িয়ে করা হয় ৪.১৫ টাকা প্রতি ইউনিট। বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতি এমানভাবে হয়েছে যে, কয়েক মাসের মধ্যেই অর্থাৎ ২০১২-র ১ ফেব্রুয়ারী বিদ্যুতের দর আবারো বাড়িয়ে ৫.০৪ টাকা প্রতি ইউনিট করা হলো। আর ঠিক তার এক মাসের মাথায় অর্থাৎ ১ মার্চ বিদ্যুতের দর আবারো বাড়িয়ে ৫.৬১ টাকা প্রতি ইউনিট করা হলো। কেন বার বার দর নিয়ে এমোনটি করা হলো? তাহলে এবারও গ্যাসের দাম কিংবা গ্যাস দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম বাড়ানো কোন যুক্তি আছে কি? অবশ্যিই নেই!
এবার আসা যাক তরল জ্বালানী তেলের বিষয়ে। আর্ন্তজাতিক বাজারে জ্বালানী তেলের প্রতি ব্যারেলের দাম যখন ১১৫ ডলার ছিলো, সে ভিত্তিতে প্রতি লিটার ৬৯ টাকা হিসেব করে ট্যারিফ নিরূপিত হয়েছিলো ভিত্তিক রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল উৎপাদিত বিদ্যুতের। বর্তমানে সেই একেই তেলের দাম ব্যারেল প্রতি দাম ৩৯ ইউ এস ডলারে এসে ঠেকেছে। বিশ্বের নামকরা তেলের বাজার বিশেষজ্ঞরা ইতোমধ্যে এ ভবিষ্যৎ বাণীও করেছেন যে আগামী ২ (দুই) বছরে তেলের এ দর তো বাড়বেই না বরং আরো কমতে পারে। আর বাংলাদেশে বর্তমানে সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা ৭৫০০ মেগাওয়াট মিটাতে তরল জ্বালানী ভিত্তিক রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল কর্তৃক বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় ২ হাজার মেগাওয়াট ও সরকার অর্থাৎ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড উৎপাদন করে ৫০০ মেগাওয়াট অর্থাৎ সর্বমোট ২৫০০ মেগাওয়াট চলে তরল জ্বালানী তেলে। তেলের আর্ন্তজাতিক বাজার দর অনুযায়ী আমাদের প্রতি লিটার ডিজেলের মূল্য পরে প্রতি লিটার ২০ টাকা। রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের মূলধনী ব্যয় ইতোমধ্যেই ৩,৫ কিংবা ৭ বছরের চুক্তির ধারা অনুযায়ী ট্যারিফ নির্ধারিত হয়েছে – যে কারনে সরকার এসব রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম অত্যন্ত অকল্পনীয় উচ্চমূল্যে ইউনিট প্রতি ১৪.০০ টাকা থেকে ১৭.০০ টাকা পর্যন্ত দিচ্ছে। ট্যারিফ নির্ধারনের কৌশল এবং প্রাইভেট পাওয়ার জেনারেশন এর পলিসি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে (লাইফ টাইম) মূলধনী ব্যয় এবং পরিচালন ব্যয় হিসেব করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দর নির্ধারন করা হয়। কাজে একই ক্ষমতার একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র যদি ৩ বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয় তাহলে তার ট্যারিফ একটি ৫ বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের চেয়ে নিশ্চিতভাবে বেশী হবে।
কাজেই দেখা যাচ্ছে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুতের কারণে সৃষ্ট ইচ্ছাকৃত বিশাল আর্থিক ঘাটতি এবং ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় তেল-গ্যাস বিদ্যুৎ নিয়ে যেসব কর্মকাণ্ড ঘটছে তাকে দায়মুক্তি দিয়ে সব দায় জনগণের ঘাড়ে চাপাতেই গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। এতে বিদ্যমান ভয়াবহ জনদুর্ভোগ ও সঙ্কট আরও বেড়ে যাবে এবং সাধারণ মানুষই হবে মূল ক্ষতিগ্রস্ত।
(আমাদের বুধবার)
এই লেখার দায় লেখকের একান্তই নিজের। এখানে প্রতিক্ষণ ডট কমের কোন নিজস্ব বক্তব্য নেই
প্রতিক্ষণ/এডি/এনজে